দেশামতর

বুদ্ধদেব বন্ছু

454৫ ,&-3-৫%

এম. সি. সরকার আ্যাণ্ড সন্স প্রাইভেট লিমিটেভ ১৪ বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ত্রী, কলকাতা ১২

প্রকাশক : জ্রীস্প্রিয় সরকার,. এম. সি- সরকার আাঁও সন্ন প্রাইভেট লিমিটেড ১৪ বঙ্কিম চাটুজ্যে স্ত্রী, কলকাতা ১২

প্রচ্ছদ 2 স্নীলমাধব সেন ঞব বায়

প্রথম অপকাাশ &বশাখ, ১৩৬৩

দাম :দশশ টাকা

মুদ্রক : শ্রী গোপালচন্দ্র রায় নাভান] প্রিন্টিং ওআক্স প্রাইভেট লিমিটেড ৪৭ গণেশচন্দ্র আঁভিনিউ, কলকাতা ১৩

হুমাস্কুন কবির কহৃদ্ববেষু

আকাশ-যাত্রী জাপান হনলুলু ৭৯ আমেরিকায় ১৫৩ য়োরোপে মিশরে ২৪৭

প্রথম খণ্ড আকাশ-যাত্রী

বেলা ছুপুর। ভান্র মাসের মেঘলা! রোর্দে আকাশ থমথমে কখনো কালো হ'য়ে বৃষ্টি, কখনো ফাকে-ফাকে আলো__ এরই মধ্য দিয়ে পথ চলেছে আমাদের রইলে। পিছনে পড়ে চিরকালের কলকাতা, বাস্‌ থামলে! দমদম এয়ারপোর্টে যাত্রী আমি একা, কিন্তু এখন পর্যস্ত বহুবচনের অস্তিত্ব আছে, কাছাকাছি কয়েকটি মানুষ দ্রিয়ে ছোটো! একটি দল আমরা। আসন্ন বিচ্ছেদের ছায়ায় সকলের মুখ মলিন, মুখে কঞ্ধা কম-_ এমনকি দলের মধ্যে ক্ষুদ্রতম যে-মানুষটি, যে এখন পর্বস্ত পাপুন নামেই পরিচিত, যার চঞ্চল কৌতুহলের দ্বাবি মেটাতে-মেটাঁতে আমি এক-এক সময় অস্থির হ'য়ে উঠি, সেও তার বালকম্বভাবের আনন্দময় চিন্তাহীনতা হারিয়ে থেকে-থেকে উন্মন হ'য়ে পড়ছে। শ্রাস্তও ছিলো সবাই, আমি ছাড়া অন্য কারো আহার হয়নি, ঈষৎ উজ্জীবনের আশায় আমি সকলকে নিয়ে বেস্তোরীয় এলাম চা এবং কিঞ্চিৎ খাছ্য নিয়ে সবেমাত্র ঘন হয়ে বসা গেছে, এমন সময় এরোপ্লেনের প্রতিনিধি এসে আমাকে তাড়া দিয়ে গেলো পরে আবিষ্কার করলুম তাড়াহড়োর প্রয়োজন ছিলে! না, প্লেন আজ বিলম্ষিত, কিন্ত তখনকার মতো! কর্ণধারের আদেশ অমান্য করা গেলো না, অসমাপ্ত চা ফেলে উঠে পড়লুম। কাস্টমস, পুলিশ, স্বাস্থ্যবিভাগ, একে-একে সব বেড়া টপকে আমরা সেখানটায় এসে ঈাড়ালাম, যার পর অযাত্রীদের আর যাওয়া! নিষেধ সরু বারান্দা একটা, কৃপণ কয়েকটা বেঞ্চ পাতা আছে, পাখা নেই ঘেঁষার্ঘেষি ভিড়ের মধ্যে অধিকাংশ মানুষকেই অধিকাংশ সময় দাড়িয়ে থাকতে হয়। সামনে বেড়া, বেড়ার ওপারে বিশাল শান-বীধানো প্রাঙ্গণ, সেখানে দিগন্তের দশ দিক থেকে নানা দেশের বাযুযান এসে নামে, আবার উড়ে চ'লে যায়। এখানটায় অত্যন্ত অব্যবস্থিতভাবে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর আকাশের পুব দিক থেকে একটি অতিকায় যান্ত্রিক বোয়াল মাছকে অবতীর্ণ হ'তে দেখা গেলো .ইনিই আমার প্লেন, চলেছেন শিঙাপুর থেকে লণ্ডন। কয়েক মিনিটের মধ্যে প্লেনের চলমান যাত্রীরা এসে সরু বারান্দার ভিড় আবে বাড়িয়ে দিলে, কথাবার্তীর চটপটি ফুটলো, গেলাশ-ভর! পানীয় ঘুরলো হাতে-হাতে ;-- এমনি ক'রে কতক্ষণ কাটলে! জানি না, তারপর হঠাৎ কেউ যেন বিশুঙ্খল মানুষগুলোকে এক গোছা তাসের মতো গুটিয়ে নিলো, নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ছুটি ঝুম এসে অমোঘ

৬৭

দেশাস্তর

দুতের মতো! চড়িয়ে গেলো পর-পর। একটিতে চলমান যাত্রীরা, অন্যটিতে আমরা যারা কলকাতা থেকে ছাড়ছি। একবার চোখ তুলে চাওয়া, হয়তো একটু থমকে দাড়ানো, একটুখানি পেছিয়ে পড়া হয়তো-_ তারপরেই একটানে “আমরা” থেকে নিছক “আমি'তে পরিণত হলুম। বাস্‌ এসে প্লেনের সামনে। দাড়ালো, প্লেনের সিড়ি দিয়ে উঠতে-উঠতে ফিরে-ফিরে পিছনে তাকালুম-_ কিছুই দেখা গেলো না। বেড়ার গা ঘেষে ছোটো-ছোটে। মানুষের সারি, মানুষের আকার ছাড়া কিছুই তাদের চেনা যায় না-_ আমার পক্ষে যার বিশেষ, তারা৷ ভিড়ের সাধারণের মধ্যে মিশে গেছে, আর সেই সাঁধারণও ইতিমধ্যেই কত যেন দূর, কত অম্পষ্ট।

এবোপ্লেনে ভ্রমণের ব্যবস্থা সব এমন নিখুঁতরকম যান্ত্রিক যে তার মধ্যে ভ্রমণের রসটুকু ঠিক যেন পাওয়া যায় না। যাদের ছেড়ে যাচ্ছি তাদের জন্য বেদনাবোধ, যে চলে যাচ্ছে তার প্রতি দূর-প্রসারিত মঙ্গলদৃ্টি__ এগুলে। মানুষের আদিম ক্ষুধার অন্যতম, এর তৃপ্তি না-হ'লে তার মানবস্বভাব ব্যাহত হয়। এবং এর তৃপ্তির জন্য বিদায়বেলাটি দীর্ঘায়িত' হওয়] প্রয়োজন, থাকা এবং চলার মধ্যে খানিকটা অনির্ণাত অবকাশের প্রয়োজন ডাক এলে যেতেই হয় মানুষকে, কিন্তু সেই যাওয়ার পথেও অপশ্রিয়মাণ তীরের সঙ্গে একটুখানি সেতুবন্ধ রচনা করার আকাঙ্ষা গৃহস্থ মানুষ কাটিয়ে উঠতে পারে না। মনে করা যাক বাংলাদেশের গ্রাম থেকে নৌকোতে কেউ যাচ্ছে, তীরে দাড়িয়ে আছে স্বজনের! ; দড়ির টান, জলের গান, পাটাতনের গোঙানি, দ্রাড়ের ঝপাঝপ শবে গলুই ঘুরে গেলো, তীরের সঙ্গে তরীর ব্যবধান আকা হ'তে লাগলো ছোটো-ছোটে| কৌকড়া ঢেউয়ের বেখায়-রেখায় অতিশয় ধীরে, ছুই দিক জুড়ে পরস্পরের দৃষ্টির মায়া জেগে রইলো-_ অনেকক্ষণ। তারপর যখন নদীর বুকে ছোট্ট ফট! হ'য়ে নৌকো মিলিয়ে গেলো, চেনা তীর আর চোখে পড়ে না, তখন কান্না-ধোয়া চোখ তুলে তাকিয়ে বড়ো! করুণ, বড়ে। সুন্দর মনে হয় এই পৃথিবীকে, গাছপালা! আকাশ জল সব যেন নতুন হ'য়ে দেখা দেয়। “কী গভীর দুঃখে মগ্ন সমস্ত আকাশ.!” -কিস্ত ছুঃখ তো! নয়, স্থুখ, বিদায়ের বেদনার পথ ধ'রে আমরা যেন বিশ্বজীবনের বুকের মধ্যে পৌছই, আমাদের ব্যক্তিগত ছোটো ছুঃখ কোন এক অন্তহীন বিশাল বেদনার মধ্যে গ'লে গিয়ে অদ্ভুত শান্ত আনন্দে.রূপাস্তরিত

আকাশ-যাত্রী

হুয়। কিংবা যখন গোঁকর গাড়িতে রওনা হ'তো৷ কেউ, তখনে! সেই যানের অহ্পাতেই বিদ্বায়ের পালাটা। মন্থর ছিলো, ক্রমিক ছিলো!) যে যাচ্ছে এবং যারা থাকছে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের আঘাত অত্যন্ত বেশি উগ্র' কিংবা আকস্মিক ছিলে! না; বন্ধুরা পায়ে ঠেটে-হেটে পথিকের সঙ্গ নিতে পেরেছে কিছুক্ষণের জন্য, হয়তো! পারুলভাঙা, হয়তো! আর-একটু দূরে কাজলতলার দিঘি অবধি এগিয়ে দিয়ে বেদনার অন্তরাগের মধ্যে ফিরে এসেছে এই একটুখানি এগিয়ে দেয়াটা আমাদের মানসিক প্রন্কৃতির পক্ষে কল্যাণকর, এতে উভয় পক্ষই ছুঃখটাকে হজম ক'রে নেবার অবকাশ পায়। বাম যখন বনবাসে গেলেন, ভরত তার সেন্ত-সামন্ত নিয়ে সঙ্গে এলেন রাজধানী ছাড়িয়ে, তারপর ভরদ্বাজ মুনির আতিথ্যে বিদায়ের অনুষ্ঠান রীতিমতো একটি উৎসবে পরিণত . হ'লো-_- তার মধ্যে পথিক এবং গৃহস্থ উভয়েরই জন্য নিহিত থাকলো মঙ্গল- কামনা ; আমরা বুঝলাম রাম এবার নিষ্কু্ঠ পায়ে গহন অদৃষ্টের মধ্যে এগিয়ে যাবেন, ভরতও সংবুত চিত্তে ফিরে যাবেন তার রাজত্বে। আর যখন শকুস্তলা পতিগৃহে যাত্রা করলেন-__ 'শকুস্তলা” নাটকের সেই শ্রেষ্ঠ এবং স্থযোগ্যভাবে বিখ্যাত অংশ-_- তখন কথমুনি যে তার দুহিতার সঙ্গে আশ্রম পরিক্রমণ করলেন, এই বিলদ্বিত ধীরমধুর বিদায়দৃশ্যে সব কথাই বল! হ'য়ে গেলো-_- যাত্রাকালে যা-কিছু আমরা বলতে চাই এবং বলতে পারি না সব। যাকে ছেড়ে যাচ্ছি তার অচ্ছে স্থতিবন্ধন, যেখানে যাচ্ছি তার প্রতিও সমর্পণের উৎস্থকতা, পরিণীতার হৃদয়ের এই ছুঃখস্সাত কম্পমান আবেগের মধ্য দিয়ে আমাদেরই যাত্রাকালীন ছন্বের ছবি আকা হ'লো-_ শুধু ছন্দ নয়, তার সমাধানেরও ছবি এমন স্বন্দর, স্থসম্পূরণ কোনো বিদায়ের দৃশ্য পৃথিবীর সাহিত্যে আর কোথাও আছে কিন। আমি জানি না, এবং বলাই বাহুল্য, পুরাকালে চলার বেগ অত্বর ছিলে! বলেই এই অলংকৃত, কোমল এবং বাস্তব ছবিটি ব্যক্ত হ'তে পেরেছিলে।। সুগয়াকালে রথের গতির বর্ণনা দিতে গিয়ে কালিদাস যদ্দি অতিরঞ্জন নাও ক'রে থাকেন, তবু আধুনিক মোটবর-রথের সঙ্গে নিশ্চয়ই তাঁপ তুলন! হয় না, তার উপর আশ্রমের মধ্যে বথের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো৷ বলেও অবকাশের অভাব ঘটেনি যদি হাল-আমলের নিয়মমতো। এমন হ'তো যে ছুম্মন্তর রোলস রয়ম একেবারে পোর্টিকোয় এসে দীড়ালো৷ এবং শকুস্তলা তাতে উঠে বসামাত্র ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইল বেগে ধাবিত হ'লো, তালে এঁ দৃহাটির

৫.

দেশান্তর

অর্থময়ত অনেক ক'মে যেতো-_- আর-কোনো কারণে নয়, সময় হ'তৌ। না.বলে।

কিন্ত পিছন ফিরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলাটা কিছু কাজের কথা নয় ; যখন মোটরগাড়ির যুগেই বেঁচে আছি, তখন এই ত্বরান্বিত পরিবেশ থেকেই যতটা সম্ভব রস নিংড়ে নেয়া আমাদের কর্তব্য। আর বস যে কোথাও নেই তাও তো! নয়, মানুষের স্থষ্টিশীলত। কালক্রমে সকল পরিবর্তনকেই আত্মসাৎ ক'রে আপন মনের স্থরের সক্ষে মিলিয়ে নেয় ; যেটা নেহাৎই যন্ত্র সেটাও অভ্যাসের বলে আবেগের বাহন হ'য়ে ওঠে। দেখা যাচ্ছে যে রেলগাঁড়িটাকে এতদিনে আমরা পরিপাক করতে পেরেছি ; যদিও সে ঘড়ির কাটায় ছাড়ে এবং প্রায় চলামাত্রই অদৃশ্ঠ হয়ে যায়, তবু আমাদের যাত্রাকালীন আকৃতি তাতে সম্পূর্ণরূপে প্রতিহত হয় না, বরং দৈহিক মানসিক উভয় অর্থে খানিকটা পদচারণার জায়গা পাওয়া যায়। কামরায় উঠে গুছিয়ে বসলুম, শিয়রে বই, কোণে জলের কুঁজো-_ ছোটো হাতব্যাগটা ঠিক আছে তো ?-- তারপর প্ল্যাটফর্মে নেমে বন্ধুদের সঙ্গে কিছু কথা, সিগারেট, একটু পাইচারি, বইয়ের স্টলটার সামনে একবার দাড়ানো, ভিড়ের দিকে তাকিয়ে দেখা যাওয়ার মুখে এই একটু বিচিত্র সময়, তখনকার মতো গন্তব্যটাকে প্রায় ভুলে গিয়ে পারিপার্থিকের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো ; হয়তো প্রায় এমন ভান করা যে আমরা যাচ্ছি না, যতক্ষণ ন] ঘণ্টার শব্দে ফিরে তাঁকাই, আর প্র্যাটফর্মের বড়ো ঘড়িটা আলো-জলা গম্ভীর মুখে জানিয়ে দেয় যে আর মাত্র ছু-মিনিট সময় আছে। তবু তার পরেও কিছু বাকি থাকে, ছুটি-একটি ছোটো অনুষ্ঠান : সবুজ নিশেন, হইসিলের শব্ধ, আস্তে রওন] হলাম, দৃরে-দূরে স'রে যেতে লাগলো হাত নাড়া; মুখ, ভিড়, উচু-ক'রে-ধরা ছোট্ট একটি সর্বশেষ সাহসী রুমাল-- তারপর হঠাৎ চলে এলাম রৌদ্র-জলা পুরোনো পৃথিবীর মধ্যে, কিংবা চিরকালের নক্ষত্র-জলা আকাশের ত্লায়। আর সেখানেই, খোলা মাঠে, ঢালু আকাশে, চলতি ট্রেনের হাওয়ায়-হাওয়ায় ছড়িয়ে গেলো আমাদের বেদনা

কিন্ত এরোপ্নেনে এরকম কোনো সুযোগ নেই : আমাদের হৃদয়বৃত্তিকে সে একটুও প্রশ্রয় দেয় না; আমাদের কুড়েমির ইচ্ছাকে, পথে বেরিয়েও ফিরে তাকাবার দুর্বলতাকে নির্যমভাবে অস্বীকার করে। ভিতরে এবং বাইরে, চলায় এবং থামায়, তার সমস্ত ব্যবস্থাই কাটাছাটা, নিক্তি-মাপা, অ-মাহ্ষিক

শু

আকাশ-বাত্রী

সিঁড়ি দিয়ে একে-একে যাত্রীরা উঠলো, শেষ যাত্রীটি যেই উঠে বসলো, অমনি আর এক সেকেও্ও দেরি না, তক্ষুনি বন্ধ হ*লো দরজা, গণর্জে উঠলো এগ্রিন। প্রথমে একটুক্ষণ মাটির উপর শান-বাধানো শড়ক দিয়ে দৌড়ে চললো, থামলো কোনো-একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এসে, যেন ওড়ার আগে দম নেবার জন্য দুন থেকে চৌদূনে পৌঁছলো এঞ্রিনের শব, যেন প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘন করার চেষ্টায় যন্ত্র) তার চরম বল প্রয়োগ কবছে। এত অনেকক্ষণ ধ'রে দাড়িয়ে-দাড়িয়ে গর্জন করলো! (অন্তত তা-ই মনে হয় ) যে মৃহূর্তের জন্য মনে হ'লো ওটা যেন শার্থতার কুুদ্ধ স্বর, মাটির টান কাটাতে পারবে না বুঝি, কিন্ত পরমুহূর্তেই দেখতে পেলাম গাছপাঁল! ছাড়িয়ে উঠে গেছি, মেঘ ছাড়িয়ে উঠে গেছি, এতক্ষণে কোথায় উঠে গেছি কে জানে “নে! স্মোকিং নিশান। নিবে গেলো যাত্রীরা__ অনেকে আবার কাহ্থনমাফিক বেল্ট বেঁধে নিয়েছিলো - সহজ হ'য়ে বসে সিগারেট ধরাঁলো, বই খুললো, পরিচারিকা সামনে এসে দাড়ালো লজঞ্ুষের ট্রে হাতে নিয়ে

রবীন্দ্রনাথ তাঁর “জাপান-যাত্রী'তে লিখেছেন যে মনের মধ্যে চলার বেগ সঞ্চিত হ'য়ে উঠলে পরে অপেক্ষা করতে হওয়াটা ছুঃসহ। যেমন কিন, বাত্রিবেল! জাহাজে উঠে বসে তার পর যদি ভোরের আগে জাহাজ ন! ছাড়ে, সেই অনভিপ্রেত স্থিতিটা আমাদের পক্ষে উপভোগ্য হয় না। সে-কথা সত্য, কিন্তু অত্যন্ত বেশি অনবকাশেও পথিকের মনের তৃপ্চি নেই। এরোপ্নেন উল্টো দ্রিকের চরমে পৌচেছে ; সে গতিসর্বন্ব, যথাসম্ভব অল্প সময়ে দেশ, মহাদেশ, পাহাড়, সমুদ্র পেরিয়ে যাওয়াই তার লক্ষ্য, আশে-পাশে অন্য কিছুরই সে অস্তিত্ব রাখেনি ছে মেরে আমাদের তুলে নিয়েই উড়ে চললো, চললো একেবারে মহাশূন্যের ভিতর দিয়ে-_ আমরা যে শুধু আমাদের অভ্যন্ত গৃহকোণ ছেড়ে এলাম তা নয়, যার দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে কখনো আমরা! ক্লান্ত হই না, বলতে গেলে সেই পৃথিবীটাকেও ছাড়িয়ে এলাম। যেন এক নিরালম্ব নিরঞন নিখিলের মধ্য দিয়ে চলেছি; বাইরে কোনো দৃশ্য নেই, প্রতিতুলনা নেই, আলো-ছায়ার সম্পাত নেই, স্বতি-জাগালো মন-কেমন-করানো৷ কিছুই নেই; একটা! লরু, লম্বাটে, ঢালু পেটিকার মধ্যে, একটা ইম্পাতে তৈরি বোয়ালমাছের উদরের মধ্যে, পরম্পরের পক্ষে অর্থহীন নানা দেশের কতগুলো মানুষ তাদের সমস্ত পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হ'য়ে এক অদ্ভুত নিঃসঙ্কতার মধ্যে বন্দী

দেশাস্তর

হ*য়ে যাত্রা করেছে ধাদের মন বৈরাগ্যের দিকে উন্মুখ, এ-অবস্থা তাদের পক্ষে বরণীয় হ'তে পারে, অতীতে ধার! সংসার ছেড়ে মহানিক্রমণ করেছিলেন, তাদের মনের পক্ষে এই বায়ুযান উপযোগী হ'তো সন্দেহ নেই; কিন্তু আমরা যার! রূপে-রসে লালিত এবং তার জন্য সতৃষ্ণ, আমাদের পক্ষে প্রয়োজন আরো! একটু ধীরগামী পার্থিব যান, চলতে-চলতেও আমরা পৃথিরীর কাছাকাছি থাকতে চাই। প্লেনে ধারা সাধারণত যাঁওয়া-আস।; ক'রে থাকেন, তারাও মহাজন- সম্প্রদ্দায়ভূক্ত, অর্থাৎ রাঁজপুরুষ অথবা বৃণিক ; যেহেতু প্রত্যেকট1 মিনিটকে তাঁরা মনে-মনে উপযোগের অঙ্কে তর্জমা ক'রে নিয়েছেন, সেইজন্য সময় বাঁচানো ছাড়া অন্ত কোনো-দিকে মন দেবার সময় নেই তাদের-_- তারাও একরকমের সন্ন্যাসী বইকি। আজকের এই প্লেনে ধারা চলেছেন মনে হচ্ছে তারা অনেকেই পূর্ব-এশিয়ার ছাীপপুঞ্জের বা আসামের প্ল্যান্টার, কিংবা হয়তো গঙ্গাতীরবর্তা ইংরেজ ব্যবসায়ী-_ প্রাচ্যদেশের বন-জঙ্গল এবং তথাকথিত “বোমান্স'-জড়িত যে-সব সচিত্র মলাটের নভেল তাদের হাতে দেখতে পাচ্ছি, তা থেকেই তাদের পেশ! এবং চরিত্র অনুমান করা সম্ভব-__- আমি নেহাতই ধদবক্রমে এদের মধ্যে ছিটকে পড়েছি

এর আগে বার ছুই দেশের মধ্যে এরোপ্নেনে ভ্রমণ করেছিলাম প্রথম বার ঢাকায়; ছোটো প্লেন, ধূমপান বারণ, কিন্তু যেন খেলাচ্ছলে মিনিট চল্লিশে যখন পৌছিয়ে দ্রিলো, মনে-মনে তারিফ না-ক'রে পারিনি ট্রেন, হ্টীমার, কুলি, ছুই ভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে নানা রকম আইন-কাহুনের হাঙ্গামা__ ভূমিলগ্ন সমস্ত বাধ এক দমকে অতিক্রম ক'রে কী সহজে হাওয়ায় ভেসে চ'লে এলো অথচ সেই যাওয়াটাও অত্যন্ত বেশি উদ্ধত নয় ; নিচে তাকিয়ে সজল সবুজ মাটি দেখা যাচ্ছিলো, শুপুরির ঝাড়, স্থতিময়ী পদ্মানদীর সরু বেখা-_ যার বুকের উপর দিয়ে কত বার পারাপার করেছি ; কখনো শীতের কুয়াশায় ভোরবেলায়, কখনো! বর্ষার হুর্যাস্তের সমরোহ সঙ্গে নি ; যেতে-যেতে শ্ীমারের ধীর- গামিতায় বিরক্তও হয়েছি; যদিও আজ ছুঃখ করি অমনি ক'রে বাংলাদেশের প্রাণের পথে যেতে-যেতে অবসরের প্রসারে বিরক্ত হবার আর কখনো স্থযোগ পাবে না বলে। যা-ই হোক, ছোটো প্লেনে ছোটো পথ পেরোনো তেমন অ-মান্নষিক মনে হয়নি, কিন্ত পরের বছর যখন বন্বাইতে যাবার নিমন্ত্রণ পেলুম, তখনও আমারই কোনো কাল্পনিক ব্যস্ততার জন্য, কিংবা ঘর ছেড়ে বেরোতেই

৮৮

আকাশ-যাত্রী

আমার মৌলিক অনিচ্ছার ফলে, যাওয়া-আঁস ছুটোই এরোপ্নেনে ধার্য হ'লো। ফিরে এসেই বুঝলুম কত বড়ে। ভুল হ'য়ে গেলো পুব থেকে পশ্চিমে ভারত- ভূমির বিশাল বিস্তার পার হয়ে গেলাম, পাঁর হ'য়ে এলাম-_ কিন্তু কিছুই দেখলাম না, শুনলাম না, জানলাম না; কোনো নিক্কিয়, নিশ্চেতন পদার্থের মতে বাহিত হলাম শুধু, শুধু উপনীত হলাম সেবারে ছিলো! বড়ে। প্লেন, সে এতটাই উচু দিয়ে যায় যে কৃপণ ঘুলঘুলি দিয়ে উদ্গ্রীব হ'য়ে তাকিয়েও কিছুই চোখে পড়ে নাঁ-_ শুধু ছায়ার মতো *অস্পষ্ট ঝাপসা পাঁটল রঙের একটা বিস্তার _ ধ'রে নিতে হবে ওটাই মাটি, ওটাই ভারতবর্ষ ভারতবর্ধ-_ হয়তো মধ্য-ভার্ত, যেখানে আছে বিদ্ধা পর্বত, নর্মদা নদী, দুর্ভেছ্য বন-_ কিন্ত আছে বা কে বলবে, কোথাও কোনো! অবয়ব নেই, রেখা নেই, গাঢ়তা নেই-__ কোলা নির্মম সঃ করণের হ্যাতা৷ বুলিয়ে-বুলিয়ে কেউ যেন সব বৈচিত্র্য মুছে দিয়েছে, পাহাড় নদী অরণ্য নগর সব এক একায়তনিক ধুর শ্লানিমার মধ্যে অবলুপ্ত। যদি অন্তন্ত একটা পথেও বেলগাঁড়ি নিতাম, তাহ'লে সারা দেশের সঙ্গে চোখের চেনাটা হ'য়ে থাকতো, কিছু দৃশ্ঠ-স্থৃতির সম্পদ নিয়ে ঘরে ফিরতে পারতাম__ হাতে-হাতে খুচরো কিছু ঘণ্টা-মিনিট বীচাতে গিয়ে ভবিষ্যতের স্থৃতির সোনা বিসর্জন দিলাম কথাটা ভাবতে এখনো আমার অনুশোচনা হয়।

সেবারে মনে হয়েছিলো এরোপ্নেনে ভ্রমণের মতো এমন বার্থ আর-কিছু নেই। মনে হয়েছিলো, এরোপ্লেনে সত্যি বলতে ভ্রমণটাই নেই, আছে শুধু পৌছনো ; ওর গতিবেগের ভিতরকার কথাটা যাঁওয়! নয়, চলা নয়, বস্তাবাধা মালের মতো ন্যনতম সময়ে চালান হওয়া আমরা চালান হই, এক-একটি নিক্ষিয় পার্সেল, দৃষ্টিহীন, অন্ভূতিবজিত, যেন কোনো তপস্বীর গুহার মধ্যে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন_- দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্ত প্রান্তে, পৃথিবীর এক শীমা থেকে অন্য সীমায়। কিন্তু দৌড় যতই লম্বা হোক, একে ভ্রমণ বলে না। আমাদের দেশে তীর্থযাত্রাকে পুণ্য বলেছে, তার আসল কারণটা দেবদেবীর অলৌকিক" মহিমা নয়, পথে-পথে নতুন দৃশ্য, নতুন মান্ষ, নতুন ব্যবহারের সঙ্গে পরিচয় এবং প্রাণের বিনিময়ের লৌকিক সার্থকতাই তার কারণ। গন্তব্যটাকে সর্বস্ব ক'রে তুলে পথটাকে তুচ্ছ করা হয়নি, বরং “মই মস্থর এবং

দেশাস্তর

ক্লেশকর চঙ্সাফেরার দিনে এই কথাটাই স্পষ্ট ছিলে। যে সতীর ছিন্নভিন্ন প্রত্যঙ্গ- গুলোতেই সকল পুণ্য গচ্ছিত হ'য়ে নেই, তা ছড়িয়ে আছে পথেরই হাওয়ায়, লিপ্ত হ'য়ে আছে পথিকেরই পায়ের কাহিনীময় চেতন ধুলোয় এই সপ্রাণ, সক্রিয় ভাবটির এরোপ্লেন কোনো অস্তিত্ব রাখেনি ; মাহুষের চলার মধ্যে তার নিজের ইচ্ছা এবং চেষ্টাজড়িত যে-একটি উৎস্থকতা স্বভাবতই জেগে ওঠে, বাযুপথে তার একতিল প্রশ্রয় নেই কোথাও ; আমাদের প্রাণের বেগ থেকে বঞ্চিত হ'য়ে শুধু যানের বেগেই এ-পথে চলতে হয় ভ্রমণের দ্রুত এবং আরাম- দায়ক উপায়গুলিকে মানুষ দুই হাত তুলে সোল্লাসে অভ্যর্থনা করেছে, কিন্তু বেগের লোভ যখন অত্যন্ত প্রবল হ'য়ে উঠে পথটাকে একদম বরবাদ ক'রে দিলে, তখন তার বঞ্চনাটাও ধরা পড়তে বাকি থাকলো না।

জীবনের যে-কোনো ক্ষেত্রে তাকালেই দেখতে পাই, অত্যন্ত বেশি ত্বা আমরা সহা করতে পারি না। আমাদের দেহ, মন, প্রাণের একটি স্বাভাবিক ছন্দ আছে , কিছুদূর পর্যস্ত তার সম্প্রসারণ চলতে পারে, কিন্তু তার প্ররুতিদ্বারা নির্দিষ্ট সীমাট1 পেরিয়ে গেলে সেই বেগ মর্মান্তিক হ'য়ে ওঠে আন্তে-আস্তে খেতে হয়, খাবার সময় অন্যমনক্ক থাকতে নেই, এই কথাগুলো অত্যন্ত প্রাচীন ঝলেই অশ্রদ্ধেয় নয়) বস্তত, যেখানে তার ব্যতিক্রম ঘটে সেখানেই স্বাস্থ্য টেকে না। হাত, মুখ এবং কনালীকে অসামান্য ক্ষিপ্র বেগে চালিয়ে ভোজের থালাকে এক মিনিটে শূন্য ক'রে দেয়৷ মানুষের পক্ষে অসম্ভব নয়, কিন্তু তাতে তার স্বাদ গন্ধের সরস সম্তোগে শূন্যপাত হয়, পরিপাকেও বি্ল ঘটে। অর্থাৎ, আহারের যেটা উদ্দেশ্ট, সেই তৃপ্তি এবং পুষ্টি কোনোটাই তাতে পাওয়! যায় না আসলে এই উদ্দেশ্ঠটাও উপায়নির্ভর ; শুধু যথোচিত উপাদান জুটলেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয় না, মেই উপাদানের সঙ্গে আমাদের ব্যবহারের একটি স্থনিয়ন্ত্িত প্রণালীও অনুসরণ করা চাই। শুনেছি, বিজ্ঞানীর ল্যাবরেটরিতে এমন বড়ি তৈরি হয়েছে যার মাত্র দুটি-একটি সেবন ক'রে মানুষ সুস্থভাবে বেচে থাকতে পারে, কিন্তু পরীক্ষা ক'রে দেখা গেছে পারিভাষিক, শাস্ত্রসম্মত “স্বাস্থ্য” নিয়ে মানুষ সুখী হ'তে পারে না,খাগ্যসারময় বটিক! থেকে আইনমাফিক পুষ্টি পেলেও খিদের কামড়ে সে ছটফট করে। এতে বোঝ গেলো, যে-কোনো প্রকারে নিছক নগ্ন উদ্দেশ্টটুকু সাধন করতে গেলে সেই মিতব্যয়িতার কার্পণ্য উদ্দেশ্েরই পরাভব ঘটে আহারের উদ্দেশ্ঠ প্রাণধারণ এবং স্বাস্থ্য রক্ষা তাতে

আকাশ-যাত্রী

সন্দেহ নেই, কিন্ত তার উপায়টাকে মানুষ বহু যুগ ধ'রে নানা রকম কাকুকার্ষে পুষ্পিত ক'রে তুলেছে, মেই অলংকারকে বাহুল্য ব'লে বর্জন করলে সময় বাচলেও প্রাণ বাচে না, খিদে মেটে না আর এই খিদেটাও শুধু পেটের খিদে নয়, মনেরও খিদে সত্যি তো, শুধু বেঁচে থাকাই তো উদ্দেশ্ট, কত স্থল এবং অনায়াসলভ্য উপায়েই তা সাধিত হ'তে পারে, কিন্তু মানুষ তা নিয়ে কত বড়ো! কাগুটাই বাধিয়ে তুলেছে__ তার স্থপক অন্ন চাই, বিচিত্র আন্বাদ এবং আন্রাণ চাই, "আলো, ফুল, সুন্দর পাত্র, আত্মীয়-বন্ধুর সাহচর্য, হাশ্যালাপ, এতগুলো বাহুল্যের সমাবেশ ঘটলে তবেই আহার নামক ব্যাপারটি থেকে সে সম্পূর্ণরকম মানবিক তৃপ্তি লাত করে। শুধু উদরের বা রসনার নয়, নাকের, চোখের তৃপ্চি, সৌন্দর্যবোধের, সৌহার্দ্যবোধের, বুদ্ধিবৃত্তির__ সব একসঙ্গে__ এবং এই সর্বাঙ্গীণ তৃপ্তির ফলে তার অন্নেরও প্রাণপদার্থ বেড়ে যায়, আর অন্ন থেকে তেজ নিংড়ে নিতেও দেহযন্ত্র উৎসাহী হ'য়ে ওঠে তেমনি, স্ত্রী-পুরুষের মিলনের মূলে যে প্রাকৃত তথ্যটা আছে সেটা অত্যন্ত জরুরি হ'লেও শুধু তার দ্বারাই এই সম্বন্ধটিকে মাপা যায় না, মান্থষের ব্যবহার তাতে বহু দূরে অতিক্রম ক'রে এসেছে এই মিলনের উদ্দেশ্য বলতে যেট1 বোঝায় সেটা নিশ্চয়ই বংশরক্ষা» জীবন্থষ্টি, কিন্ত সংক্ষিপ্ততম উপায়ে প্রজননকর্মটি সম্পন্ন ক'রেই হে! মানুষ থামেনি, এর চারদিকে ঘিরে-ঘিরে সে স্ষ্টি করেছে এক বিশাল ভাবলোক, স্থষ্ট করেছে প্রেম, আনন্দ; সৌন্দর্য ; সেই পরিমগ্ডলের পরতে-পরতে জড়িয়ে আছে

ষুগ্রান্তের মানস সঞ্চয়কে অস্বীকার ক'রে উলঙ্ষভাবে উদ্দেশ্য প্রয়ো

কুরতে মান্য তখনই উদ্ধত হয়, যখন সে আর প্রকুতিস্থ থাকে না কিন্ত সংবিৎ ফিরে এলেই সে দেখতে পায় যে তাঁর দেহমনের সকল বৃত্তির সার্থকতা & দুরপথেই, ঘুরপবেই, ত্ সময়সাপেক্ষ, প্রতীক্ষাজড়িত, আবেগ্মণ্ডিত বিলম্ই_ তার স্বধর্নী_ আর দেই জগতে, যেখানে কল্পনার আলো-ছায়ার খেলা চলছে, যেখানে বাস্তব রূপান্তরিত হ'য়ে হৃদয়ের সত্যে পরিণত হচ্ছে, সেখানে প্রকৃতির সমস্ত দাবি মিটে গিয়েও অনেক-কিছু উদ্ত্ত থাকে। সেই উদ্বৃত্ত অংশটা এতই বড়ো যে তার মধ্যে জৈব উদ্দেশ্টটাকে আর খুঁজে পাওয়া! যায় না। আমরা যখন সবান্ধবে সুসজ্জিতভাঁবে ভোজের সভায় উপস্থিত হই, তখন আমর! কখনো ভাবি না যে নেহাতই বেঁচে থাকার জন্য আমাদের' কিছু বনজ এবং

১১

দেশান্তর

জান্তব পদার্থ গলাধঃকরণ করতে হচ্ছে। বাসরশয্যার বেপথুমান বর-বধুর মনেও এমন চিন্তার কদাচ উদয় হয় না যে তীরা আজ পরস্পরের মধ্যে দ্রব হ"য়ে যাচ্ছে একটি সন্তানের জন্ম হবে কলেই। অর্থাৎ যাকে উদ্দেশ্য বলছি, সেটা সবচেয়ে সুন্দরভাবে সার্থক হ'তে পারে তখনই, যখন মানুষ সেটাকে ভুলে যায়।

কিন্ত এরোপ্রেন মুহূর্তের জন্যও তার উদ্দেশ্ত ভোলে না, ভুলতে দেয় না সে মৃতিমান এফিশিয়েন্সি, কর্মপটুতা ; ম্তার উপায় নিরাকার, পথ শৃহ্যময়, তার মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে শুধু পৌছবার প্রকাণ্ড একটা একটানা প্রতিজ্ঞা উদ্দেশ্যসিদ্ধির এই অত্যধিক গরজটাকে মানুষ তার কাজের ক্ষেত্রে বাহব! দিতে পারে, এতে তার হিশেবের খাতায় মুনফার অঙ্কের চক্রবৃদ্ধি সম্ভব, কিন্তু তার অ'নন্দের ক্ষেত্রে কুড়েমি করাই তার স্বভাব, যেখানে তার ভালো লাগে সেখানেই সে দেরি করে, ধীরে-স্স্থে, চেখে-চেখে, রসিয়ে-রসিয়ে ভোগ করতে চায়। খবর-কাগজের হেড-লাইনগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিতে ছু-মিনিটের বেশি সময় লাগে না, কিন্তু কবিতার লাইনের ফাকে-ফাকে অদৃশ্য লিপি পড়ে নেবার জন্য সারা জীবনও যথেষ্ট কিনা কে জানে আপিশে বসে কাজের কথাবার্তা কাটায়-কাটায় মিনিটের মাপে চলতে পারে, কিন্তু বাড়িতে যখন বন্ধুদের আহবান করি তখন ঘড়ির দিকে পিঠ ফিরিয়ে অবসরের বারান্দাটাতেই বসতে হয়। পথে বেরিয়ে পথটাকেও আমরা এমনি ক'রে উপভোগ করতে চাই ; খু'ঁটে-খুটে খেতে চাই একটু-একটু ক'রে; থেমে, তাকিয়ে, জিরিয়ে, জুড়িয়ে, আস্তে-আস্তে অত্যন্ত থেকে নতুনের মধ্যে অগ্রসর হ'তে চাই, আর এই অন্ুক্রমিক প্রক্রিয়ার ফলেই নতুনকে উপলব্ধি করা সহজ হয়। কেননা, যদিও আমর] মুখে বলে থাকি যে মনের চেয়ে দ্রুতগামী আর-কিছু নেই, তবু আসলে আমাদের মনের ছন্দ আমাদের রক্তেরই ছন্দ__ সেই রক্ত, যে এখনো সম্পূর্ণভাবে বুদ্ধির বশ মানেনি, অমিতভাবে মুকুলের অপব্যয় না-ক'রে যে এখন পর্যস্ত একটি ফলও ফলাতে পারে না। মনের স্বভাঁবট1 বিলাসী, লয়টা টিমে, ছন্দ মন্দাক্রান্তা তার অভিজ্ঞতার ধারা. ্বীর্ঘনূত্রী, খুশির পথ আঁকাবীকা এবং বিশ্রামবহুল, যে-কোনো! নতুন দিকে যাত্র! করার জন্য সে সৈনিকের মতো! এক পায়ে খাড়া থাকতে পারে না, বিলাসীর মতো! তৈরি হ'তে সময় নেয়। এরোপ্লেন আমাদের মনের এই

৯২

আকাশ-যাত্রী

স্বাভাবিক ছন্দটাকে লঙ্ঘন ক'রে চলে, তাই তার সঙ্গে আমাদের কোনো মানবিক সম্বন্ধ স্থাপিত হয় না। আমর! তার বিবরে বসেও দূরে থাকি__ দূর, বিচ্ছিন্ন, নিলিপ্ত) পথটাকে সৈ এমনতর গোগ্রাসে গিলে নেয় যে আমাদের পক্ষে সেটা প্রায় উপবাসেরই শামিল, হাঁজার-হাঁজার মাইল পেরিয়ে চলেছি ঝ্লেই মনে হয় না। ভূমিকা! নেই, পূর্বাভাস নেই, প্রস্ততির অবসর নেই, প্রাসঙ্গিক, আনুষঙ্গিক ব৷ প্রক্ষিপ্ত কিছু নেই, এক ফোটা বাহুল্য নেই কোথাঁও-_ আমাদের সব ক-টা স্থস্থ গ্রবৃত্তি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ক'রে ওঠে

বাহুল্য নেই, এই কথাটা আক্ষরিক অর্থে সত্য শুধু যেবাইরে তাকিয়ে ্টব্য কিছু নেই তা নয়, ভিতবেও এমন কিছু নেই ষেটা মনের পক্ষে আকর্ষণযোগ্য এগ্রিনের গর্জন এবং বসবার সারবীধ। ব্যবস্থার জন্য সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপের স্থযোগ অত্যন্ত পরিমিত; দৈবাৎ আপনি যার পাশে আসন পেয়েছেন বড়ো! জোর তার সঙ্গে ছু-একট] মামুলি কথার বিনিময়__ যদি অবশ্ঠ তার ভাষা! আপনার জানা থাকে কিন্তু ভাষার বাধা না-থাকলেও আলাপ-পরিচয়ে কোনে পক্ষই তেমন উৎসাহিত হয় না, কেননা এই পথের মেয়াদ বড়োই ক্ষণস্থায়ী, বলতে গেলে এক্ষুনি তো নেমে যাবো, আর তার পরেই এই মান্ষগুলেো কে কোথায়। জাহাজে, যেখানে অনেকগুলে৷ দীর্ঘ দিন কাটাতে হয়, সেখানে পারম্পরিক মানসিক বিনিময়ের দিকে স্বভাবতই আগ্রহ জাগে, বন্ধুতা, গ্রীতিস্থাপন, হয়তো! বা কোনো নাটকীয় বা হার্দ্য ঘটনার পক্ষেও যথেষ্ট অবসর মেলে সেখানে রেলগাডিতেও তা-ই; তার মেয়াদ খুব দীর্ঘ না-হ'লেও নানা রকম উপকরণে সমৃদ্ব__ স্টেশনে থামা, যাত্রীদের ওঠা-নামা, সকালে-সন্ধ্যায় আলো-ছায়ার আবর্তন-_ ধাবমান বিচিত্র ঘণ্টাগুলি ভরে সহ্যাত্রীরা পরস্পরের প্রতি একেবারেই উদাসীন হয়ে +সে থাকে না; কোনো! প্রয়োজনে, নয়তো সৌজন্য অথবা কৌতুহলবশত, কিৎবা নেহাৎই হয়তো! পথের শ্রান্তি দূর করার চেষ্টায়, কেউ-না-কেউ কারো-না-কারো সঙ্গে আলাপে প্রবৃত্ত হয়েই থাকে কিন্তু এবোপ্লেনে সে-রকম কোনো পরিবেশ নেই, আবহাওয়া নেই। যাত্রীরা শারীরিক অর্থেই একে অন্যের দিকে পিঠ ফেরানো; কুঁজোর জল, টিফিন-কেবিয়াবরের খাবার, এই সব সামাজিকতার স্ত্রগুলিও অনুপস্থিত, যেহেতু সকলের জন্য সব রকম পানাহারের ব্যবস্থা প্রেন-কোম্পানির কর্তারাই ক'রে রেখেছেন অতএব এই বাযুধানের বাইরেটা

১৩

দেশাস্তর

যেমন চোখের পক্ষে শূন্য, ভিতরটাও মনের পক্ষে তাই। এমনকি এর অবয়ব সুষ্ঠ জ্যামিতিক চিত্রের মতো বাহুল্যহীন ; ওজন বাচাতে হবে ব'লে এর সমস্ত মাপজোক যথাসম্ভব ছোটো, স্বল্লতম পরিসরের মধ্যে প্রচুরতম সেবার ব্যবস্থা ধরাতে গিয়ে মানষের উদ্ভাবনীপ্রতিভা একে কাজ-চালানো কৃপণ ইকনমির আদর্শ ক'রে তুলেছে ছু-সার চেয়ারের মাঝখানকার গলি-পথ দিয়ে দু-জন মানুষ পাশাপাশি হাটতে পারে না, অথচ ওরই একপ্রান্তে পানীয় জলের কল পাবেন, পাশে দেয়াল-তাকে সারি-সারি সচিত্র পত্রিকা, আ'র-এক প্রান্তে অতিশয় ক্ষুদ্র একটি বাথরুম, সেখানে একই কলে ঠাণ্ডা আর গরম জল বেরোচ্ছে, হাত ধোবার সাবান থেকে দাঁড়ি কামাবার বৈদ্যুতিক ক্ষুর পর্যস্ত প্রসাধনের সরঞ্জাম আছে সাজানো ; কিন্তু প্রকোষ্ঠট এতই ছোটো যে ভিতরে যাওয়ামাত্রই বেরোবার জন্তে ছটফট ক”রে উঠতে হয়। আর বেরিয়ে এসে আপনাকে অবশ্ঠ আবার সেই নির্দিষ্ট আসনটিতেই বসতে হবে, তার হাতলেই আ্শ-ট্রে বসানো আছে, গেলাশ রাখার গর্ত, খাবার ট্রে বসাবার খাজ, মাথার উপরে বই পড়ার ছোটো৷ আলো, হাত বাড়ালে তাকের উপর পশমি ওড়না, শীতবোধ হ'লে পেড়ে নেবেন। সামনের চেয়ারটার পিঠের দিকে যে-খলিটা আছে সেটা আপনার প্রাপ্য; তাতে আপনার খাবার-ট্রে অপেক্ষা করছে, হাতের বইপত্র থাকতে পারে মোটের উপর, যাকে স্থবিধে বলা হয় তার আয়োজনে কোথাও এতটুকু ত্রুটি বা উদাসীনতা নেই, পানাহারের আতিথ্যও দরাজ--_ খুব সম্ভব বাযুপথের অন্যবিধ সমস্ত বঞ্চনার ক্ষতিপূরণন্বরূপ আহারে এবং উপাহারে আহ্বান আসে অত্যন্ত ঘন-ঘন। এই ব্যবস্থাটি না-থাকলে যাত্রীদের অবস্থা প্রায় দুঃসহ হ'তো৷। তাতে সন্দেহ নেই-_ অন্তত এট] শ্রান্তিনিবারক, ব্যাহত তন্দ্রায় পুনরুজ্জীবক, দিনরাত্রির যে-কোনো সময়ে মানচিত্রের যে-কোনো! একটি বিন্দুর উপর অচিরভাবে ভাসমান হবার পক্ষে কথঞ্চিৎ উৎসাহজনক-_- আর তাছাড়া যখন নাস্তিমান ব্যোমমার্গে ক-ধাতুটি প্রায় অবলুপ্ত, তখন কিছু-একট1 করতে পেলেই মনট। একটু সজীব হ'য়ে ওঠে তবে কথাটা এই যে মানুষ তো! শুধু ক্ষৎ-পিপাসার বাগ্ডিল নয়, তা ছাড়াও তার ছু-চারটে যা! চাহিদা আছে-_ অনুগ্র, অপেক্ষমাণ কিন্ত অপ্রতিরোধ্য চাহিদ_- সেগুলোকে মাটির কোলে পরিত্যাগ করেই বিমান তাঁর জয়যাত্রায় বেরিয়েছে কোনো রঙের চমক, কোনো প্রাণের দোলা, কোনো বৈচিত্র্যের

১৪

আকাশ-যাত্রী

আভাঁস-_ দৈবাৎ জুটে যায় তো ভালে!, কিন্তু কেউ যেন আশা না করে। এরোপ্রেনে যে-মুহূর্তে উঠে বসলেন, সে-মুহূর্তে আপনার নিছক দৈহিক অস্তিত্ব- টুকুর মধ্যে সীমিত হ'য়ে গেলেন আপনি, তার বাইরে আর কিছুই নেই-_- একটা পাখি চোখে পড়বে না, কচিৎ কখনো অনেক নিচে একটুখানি প্রেতের মতো মেঘের ধৌয়া__এমন কি কৌশলময় নীবন্ধ যন্ত্রণার মধ্যে দিনরাত্রি প্রভেদও যেন লুপ্ত হ'য়ে যায়। এই শেষের কথাটা! একটু বাড়াবাড়ি হ'য়ে গেলো; আসল কথাটা এই যে বিমীনের মধ্যে দিন আর বাত্রি এই ছুটো স্থল বিভাগেরই অস্তিত্ব আছে, সকাল, বিকেল, দুপুর প্রভৃতি উপবিভাগগ্ডলোর স্পষ্ট কোনে পরিচয় পাওয়া যাঁয় না, আর তাদের সক্ষম থেকে স্ক্মতর যে-সব শ্রুতি, মীড়, ঝংকার নিয়ে শাশ্বতভাবে আমরা বসবাস ক'রে আসছি, তারা তো কোন দুরে নিশ্চিহন হ'য়ে তলিয়ে গেছে। বাইরে তাকালে রোদ্দর বোঝা যায়, সন্ধে হ'লে বাতিও জলে, কিন্তু প্লেনের মধ্যে দিনের আলো সর্বদাই ম্লান, তাপের মাত্রাও নিয়ন্ত্রিত, তাই পৃথিবীর আহিক আবর্তনের আলোছায়ার সম্পাত এখানে ভালো ক'রে পৌছতে পাঁরে না। দুপুরবেলা তুলনায় ছুপুর-রাত্তিরে শীত একটু বেশি করবে, বিকেলের চাইতে সকালের আলো একটু হয়তো কড়া লাগবে চোখে, কিন্তু এই ভিন্ন-ভিন্ন সময়গুলোর মধ্যে যে-বিশেষ এক-একটি মানসিক ভাব জড়িত আছে, এই পর্দানশিন, শীলমোহর-করা অন্তঃপুরে তাদের প্রবেশের কোনো পথ নেই

সবচেয়ে অদ্ভূত কথাট1 এই যে এরোপ্লেনের গতির বেগ আমাদের অনুভূতির কাছে প্রত্যক্ষ নয়। মানুষের তৈরি এই যন্ত্র বেগের শক্তিতে বিধাতার অনেক স্থষ্টিকেও ছাড়িয়ে গেছে; কোনো তুফান এত জোরে ছোটে না, কোনো বন্যার জল এমন বেগে জনপদ ভামিয়ে নেয় না, যেমন এই পুষ্পক রথ নীলিমাকে দীর্ণ ক'রে চ'লে যায়। কিন্তু হ'লে হবে কী-_ এই বেগ আছে শুধু তথ্যে, শুধু গণিতে, আমার চেতনায় তার অণুযাত্র ইঙ্গিত নেই। ঘণ্টায় ছু-শো, তিনশো, পাঁচশো মাইল বেগে চলেছি, কিন্তু বাইরে কোনো! চলমান দৃশ্ঠের প্রমাণপত্র নেই ঝলে, আর প্লেনের গতি নিরতিশয় মস্থণ ব'লে, আমাদের মনে হয় যেন থেমেই আছি, শূন্যে ঝুলে আছি স্থির হ'য়ে, যেন এরোপ্লেনটা কোনো অতিকায় ভ্রমর-দাীনবের মতো! আকাশের বুকের মধ্যে নিশ্চল হয়ে লৌহশবে 'গধ্ধিত হচ্ছে। দূরকে জয় করবে ব'লে যে-মানুয সমুদ্রে প্রথম ৬ভলা ভাসিয়ে-

১৫

দেশান্তর

ছিলো, লাফিয়ে উঠে বসেছিলো৷ বুনে। ঘোড়ার পিঠের উপর, তার শক্তি প্রবল থেকে প্রবলতর হ'তে-হ'তে নিজেরই মধ্যে এই অদ্ভূত বিরোধ জাগিয়ে তুলেছে : যখন সে সত্যি-সত্যি দপকথার পক্ষীরাজ ঘোড়াটার সওয়ার হ'য়ে বসতে পারলো, তখনই তার চেতনার কাছে সেই গতির কোনে অর্থ থাকলো! না।

এ-কথা মানতেই হবে যে গতির একটি নিজস্ব এবং বিশ্তদ্দ আনন্দ আছে, সেটা প্রায় নেশারই মতো কাজে লাগছে বলে নয়, সময় বাচানো যাচ্ছে বলে নয়, নিজের বা জগতের কোনো উপকার করা যাচ্ছে ব'লে নয়-_ চলছি বলেই ভালো লাগে আমাদের, চলছি বলে অনুভব করতে ভালে! লাগে, সেই অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে আমাদের রক্তে, ন্নাযুতন্ত্রীতে, কোনো উদ্দীপক স্থরার মতো! মনটাকে আবিষ্ট ক'রে তোলে শিশুরা যে-কোনো চাকাওল! খেলনা নিয়ে মেতে ওঠে, সেটাকে ঠেলতে পারলেও তারা খুশি, চড়তে পারলে তো কথাই নেই। শিশু নয় এমন মানুষও নাগরদোলা ভালোবাসে, সমুদ্রের ঢেউ খেতে ভালোবাসে, গাড়ি চড়তে ভালোবাসে কিন্ত-__ অন্ডাস হাক্সলি অনেক আগেই এ-কথাটা বলেছিলেন__- এই বৈজ্ঞানিক যুগে যান যত উন্নত হচ্ছে, গতির সত্যিকার অনুভূতিটাও ক্ষীণ হ'য়ে আসছে ঠিক সেই অনুপাতে ঘোড়ায় চণড়ে ঘণ্টায় বারো মাইল ছোটার যে উন্মাদনা, রেলগাড়িতে তিরিশ মাইলও সে-তুলনায় ক্ষীণ, আবার রেলগাড়িতে ষাট মাইলে যে-তীত্র রস পাওয়! যায়, মহ্থণ মোটরগাড়িতে তা পেতে হ'লে আইন এবং স্থবুদ্ধির শাসন অমান্য করতে হবে। যত দামি, যত বড়ো, যত নিখৃ'ত-নিমিত হয় মোটরগাঁড়ি, তার গতিট1 আমরা! ততই কম অন্থভব করি; আর এই গতির প্রগতির সর্বাধুনিক ধাঁপটিতে, এক-এক ঘণ্টায় এক-এক দেশ পেরিয়ে-যাওয়া হাওয়াই জাহাজে, এই অনুভূতি একেবারেই শৃন্ে এসে ঠেকলে!। কিছুই না? চুপ ক'রে বসে আছেন শুধু, চুপ, স্তব্ধ__ শুধু একট] একঘেয়ে গুঞ্ন শুনছেন, তা ছাড়া সব স্তব্ধ, মিনিটের পর মিনিট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় থেমে আছেন__- অন্তত তা-ই মনে হচ্ছে আপনার। আর য। আমাদের মনে হয় সেটা দিয়েই তো কথা, আমাদের. চৈতন্যের কাছে সেটাই তো মূলাবান।

অবশ্য এ-রকম নাঁ-হ'য়েও উপায় ছিলে! না, কেননা এরোপ্নেনের গতির অনুভূতি সহ্য করা মানুষের রক্তমাংসের পক্ষে সম্ভব নয়। শুনেছি, একবার

১৬

আকাশ-যাত্রী

কোথায় একটি চলতি প্লেনের দরজাট1 হঠাৎ খুলে যায়, তাতে আর-কোনে! বিপদ হয়নি, শুধু হাওয়ার প্রচণ্ড ঝাপটেই অনেক মানুষ অজ্ঞান হ'য়ে যায়, একজন হার্টফেল ক'রে মারা পড়ে। অতএব যাতে মুহূর্তের জন্যও গতিট! আমাদের বোধগম্য না হয়, সেই রকমের ব্যবস্থা করাই যুক্তিসংগত হয়েছে। যুক্তিসংগত-_ নিশ্চয়ই, তবু এই কথাটা থেকেই গেলো যে অভিজ্ঞতা! হিশেবে প্রুস্পক-বিহার ব্যর্থ; এর মধ্যে এমন কিছুই স্থান পায়নি, যা মাছষের ব্যক্তিত্বকে প্রশ্রয় দেয়, ধ্যক্তিত্বপকে সমৃদ্ধ ক'রে তোলে। নিতান্ত নৈর্যক্তিক এই যাত্রা, নৈসগিক বা মানবিক সঙ্গরহিত, আলোছায়ার বৈচিত্র্যবজিত ; বিবর্ণ, ধুসর অস্পষ্টতার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি আমরা, বসে-ব'সে কখনো চেয়ারটাকে উচু ক'রে বাইরে তাকাই বা বই খুলি, কখনো নামিয়ে নিয়ে হেলান দিয়ে চোখ বুজি, কখনো পা ছুটোকে সম্ভবমতো৷ ছড়িয়ে দিই, কখনো বা গুটিয়ে নিয়ে বসি, কখনে! হাটুর উপর ছড়িয়ে দিই ওভারকোট, কখনে। বা তাকে তুলে রাখি সেটাকে-_ এটুকু, এইটুকুমাজ্ত বৈচিত্র্যসাধন, যা আমাদের হাতে আছে। এবং এই কারণেই-- যদিও এবোপ্পেন এ-যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীত্তিমান, তবু মানুষের হৃদয়ের মধ্যে, প্রেমের মধ্যে সে এখনো স্থান পেলো! না। যুদ্ধের প্রয়োজনেই এর আশ্চর্য উন্নতি হয়েছে, এর গড়ন, চলন, বলন ইত্যারদিও সৈনিকের মনোভাবের সঙ্গেই মানিয়ে যায়, গৃহী মানুষ এর জবরদস্তিতে হাঁপিয়ে ওঠে টনিক নিজেও একটা হন্তে পরিণত হয়েছে, সে একটা অন্ধ বধির বিরাট যন্ত্রশক্তির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ মাত্র, তার কাছে ট্রেন ট্যাঙ্ক জাহাজ বিমান সবই সমান কিন্ত যে-সানুষের মন এবং হৃদয় নামক উপসর্গ ছুট! এখনো সজাগ, তার সঙ্গে এযোপ্লেনের সহজ ব্যবহারের পথ খোলা নেই। তুলনায় কত বেশি আশ্চর্য এবং সজীব মনে হয় রেলগাড়িকে; যখন বিশাল নামহীন প্রাস্তরের উপর করুণ হয়ে সন্ধ্যা নামে, কিংবা যখন রাত্রে আমাদের ঘুমের মধ্যে দোল খেতে-খেতে তার গতির মত্ত আলোড়ন সমস্ত সত! দিয়ে শোষণ ক'বে নিই, কিংবা হয়তে। নির্ঘূম চোখে তাকিয়ে থাকি ঘুরে-চল! দিগন্তের উপর স'রে-স'রে-যাওয়া তারাদের দ্রিকে কত বেশি সুন্দর এবং বান্তব্ব মনে হয় জাহাজটাকে, ভিতরে যার নাচ, গান, আলো, উৎসব আর বাইরে অকুল সমুদ্রের উপর অসীম অন্ধকার, হয়তো! বা পরিত্যক্ত ডেকের নির্জনে একলা কোনে! ছুঃখী মান্নষ__ যার একদিকে নিঃসঙ্গ টাদ ঘন আত্মহত্যা

১৭

দেশাস্তর

ক'রে ডুবে মরে, আর-একদিকে সগ্যন্গাত হুর্ঘ উজ্জল চোখ মেলে তাকায়) একদিকে জলরাশির রহস্যময় গম্ভীর বিস্তার, আর-একদিকে বন্দরের বর্ণ, গন্ধ, শবের এখ্বর্ব। স্থলপথে বা জলপথে ভ্রমণের মধ্যে এই যেগুলো উপরি-পাওনা, এগুলোকেই মান্ষ সত্যি-সত্যি পেয়েছে, এগুলো! তার ভাবের তাপে জীর্ণ হয়েছে, মনের তাতে বোন! হ'য়ে গেছে-_ সেই সঞ্চয় এতই বড়ো যে তার তুলনায় পৌঁছনোটা গৌণ ঘটনা ব'লে মনে হয়। সেই সামগ্রিক অভিজ্ঞতার বুনোনের মধ্যে এরোপ্রেন কিছু যোগ 'করতে পারেনি, মানুষের চিন্ময় সম্পদ যেখানে যুগে-যুগে জমা হচ্ছে এবং বদলে যাচ্ছে, সভ্যতার সেই উপরতলায় কোনে দান নেই তার। আজকের দিনের কথাসাহিত্যে জাহাজ কিংবা রেলগাড়ির পটভূমিকা অসংখ্যবার পাওয়! যাবে, কিন্তু এরোপ্লেনকে ঘটনাস্থল ক'রে কোনে৷ আধুনিক সমার্সেট মম গল্প লেখেননি ।-_কিন্ত এই সমস্ত উক্তি- গুলোর পরে একটা “এখনো” যোগ করা৷ উচিত ; হাজার হোক, এরোপ্নেনটা আনকোরা! নতুন, আমাদের পুত্র কিংবা পৌত্রদের সময়ে লেখকরা যে এটাকেও তাদের মূলধনের মধ্যে পুরে নেবে না সে-কথা কি কেউ জোর করে বলতে পারে? ততদিনে এই যন্ত্রারও চেহারা ঠিক এই রকমই থাকবে ব'লে ভাব। যায় নাঁ_- তবে সেটা কি আরো কঠোর, আরো নিপুণ, আরো নিভূল, আরো! নির্মম হবে, না কি হঠাৎ কোনে দুর্বল মুহূর্তে একটুখানি বক্তমাংসকে প্রশ্রয় দিয়ে ফেলবে, সে-কথা আজকের দিন উদ্ভাবকদেরও অজ্ঞাত। কিন্ত যাই হোক না, এরকম একটা সম্ভাবনাকে মেনে নেয়াই ভালো মনে করি, কেননা ইতিহাস বিবর্তনপ্রবণ, মানবস্বভাব আশ্চর্বরকম স্থিতিস্থাপক, এবং অভ্যাসের মতো.রাজবৈদ্য আর নেই।

১৮

্‌ | |

তিনটের সময় প্লেন ছাড়লো কয়েক মিনিটের মধ্যে জানতে পারলাম যে আমর! উঠে এসেছি তেত্রিশ হাজার ফুট উঁচুতে, চলেছি ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে- চারশো মাইল। জানতে পারলাম__ তার মানে, খবর হিশেবে জানলাম, এই খবরট] অন্য কারো সম্বন্ধে হ'লেও ক্ষতি ছিলো না। যেমন আমরা কাগজে পড়ি যে অমুক বৈজ্ঞানিক পাধিব বায়ুমগ্ডল অতিক্রম ক'রে বহু উধের্ব বিহার ক'রে এসেছেন, এও প্রায় সেই বকমেরই জানা “তেত্রিশ হাঁজার+ “সাড়ে- চারশো”, এই অঙ্কগুলো আমাদের বুদ্ধির খাতায় নিস্তাপভাবে টুকে নিলাম শুধু, উদ্দাসভাবে তথ্যের ঝুলিতে পুরে নিলাম, তার রোমাঞ্চ, তার উত্তেজনা, তার ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধি-_ সমস্তই বাদ গেলো, এবং বাদ গেলো ঝলেই সম্ভব হলো. ঘটনাটা এভারেস্টের চুড়োর চেয়েও উঁচুতে উঠে এসে আমরা ষে সুস্থ শরীরে টিকে আছি, স্বাভাবিকতাবে নিশ্বাস নিচ্ছি, এতেই বোঝা! যায় কোথাও একটা ফাকি আছে। সেটা এই যে এরোপ্নেনের ভিতরকার আবহাওয়া সযত্বে নিয়ন্ত্রিত; বাইরে যদিও নির্বাত হিমলোক, তবু এই মন্ত ফাপা নিরেট মাছটার পেটের মধ্যে ঠিক ততটাই তাপ আছে, হাওয়া আছে, যতটা পাওয়া যায় সাড়ে-সাত হাজার ফুট উঁচুতে উঠলে অর্থাৎ, এঁ তেত্রিশ হাজারটাই ফাকি, কথার কথা, আমর! আবহাওয়ার হিশেবে-- যদিও আর- কোনে৷ হিশেবেই নয় আছি মাত্র উটকামণ্ডে, কোনো শৈলশৃক্ষে প্রথম পৌছবার মতোই হঠাৎ শীতের হ্ুখকর ম্পর্শটুকু পাওয়া যাচ্ছে। তেমনি, এঁ সাড়ে-চারশে! মাইলটাও আছে শুধু খাতায়-পত্রে, পাইলটের পঞ্ধিকায়, আসলে আমরা ম্পন্মমান, শব্ধায়মান নিঃক্োত একটা গতিহীনতার মধ্যে মগ্ন হ'য়ে আছি।

যে-প্নেনটায় চলেছি সেটা বিমানবিজ্ঞানের ইদীনীস্তন অেষ্ঠ কীতি ব'লে কথিত, “কমেট”-উপাধিধারী ব্যোমযান। এই যন্ত্রটি উত্ভীবিতি হবার পর থেকে, বিশেষত কলকাতার কাছেই সম্প্রীতি একটি বিরাট অপঘাত ঘটে: যাওয়ায়, এইটে নিয়ে কাগজে এবং লোকমুখে বিস্তর আলোচনার প্রচার হয়েছে।' বোধহয় অপঘাতের পর থেকে লোকেরা একটু বাকা চোখে এর দিকে তাকিয়ে থাকে, তাই এর গৌরবের কথা আরো বেশি চেঁচিয়ে বলার প্রয়োজন হ'লো। অন্তত কলকাতায় আমার ভ্রমণের ব্যবস্থার ভার ধালের উপর ন্যস্ত

১৯

দেশাস্তর

ছিলো, তারা, নিজের! মাকিন হওয়া সত্বেও, এই ইংরেজ তরণীর প্রশংসায় প্রচুর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। তাদের মুখে শুনেছিলুম যে এই যাস্ত্রিক ধূমকেতুর গতি নিঃশব্দ এবং ্পন্দনহীন, আভ্যন্তরীণ আরাম বিষয়েও নাকি অন্য কোনে! নভোচারীর সঙ্গে তুলনাই হয় না। শুনে ভেবেছিলুম কী জানি কী ব্যাপার, দেখে নিরাশ হ'তে হ'লো। দ্েখতে-শুনতে ( শুনতেও ) অন্য যে-কোনে। প্লেনেরই মতো, গড়নে এবং কলকজায় কিছু তফাৎ থাকলেও ষাত্রীর্দের জন্য তেমনি আটোর্সীটো। নির্তি-মাপা ব্যবস্থা, সংকীর্ণ পরিসর, স্তম্ভিত সময়। আওয়াজ এবং আন্দোলন একটু হয়তে। কম হয়, কিন্তু হয় না বললে সত্যের অপলাপ ঘটে অবশ্ঠ ইনি একাধিক অর্থেই সবচেয়ে উন্নত তাতে সন্দেহ নেই, এত উঁচুতে আর-কোনো প্লেন উঠতে পারে না, এমন বেগও অন্য কোনোটার নেই, কিন্তু আগেই বলেছি-_ আপনার আমার তাতে কিছুই এসে যায় না। প্লেনে উঠে বসার পর সেটা ঘণ্টায় ছু-শেো৷ মাইলই চলুক আর পাচশে। মাইলই চলুক, আমাদের পক্ষে তা একই কথা, আমাদের অনুভূতি, অর্থাৎ অনুভূতির অভাবটা ঠিক একই রকম যখন তিরিশ-হাজারি উধ্বলোকে ইন্দ্রসভার গ! ঘেঁষে চলেছি, আর যখন মাক্স পনেরো কিংবা কুড়ি হাজার ফুটে ফিশ্নরলোকে বিরাজ করছি, এ-ছুটে! অবস্থার মধোও কোনোরকম প্রভেদ বোঝার উপায় নেই। অতএব, যা-ই বলুক না বিজ্ঞাপনে, আপনি কোনদিক থেকে জিতলেন সেটা ঠাহর করা খুব শক্ত এক, কলকাতা-লগুন পাড়ি দিতে গিয়ে আপনার জীবনের সাত-পাতটি মহামূল্য ঘণ্টা আপনি বাঁচাতে পারলেন, এই অদৃষ্ঠ এবং নির্বস্তক লাভে থলিটাকে আকড়ে নিয়ে যকিঞিৎ সখী হবার চেষ্টা কর! যেতে পাবে-_ তবে সাত ঘণ্টা! সময় কোন কারণে মহামূল্য, স্টো বাঁচিয়েই বা আপনার কী সার্থকতা! হ'লো, তাতে কোন স্থ্কৃতি সাধন করলেন বা কোন আনন্দ উপভোগ করলেন, এ-সব অবশ্য আলাদা কথা

অবশ্য আরে! একটা লাঁভ এতে আছে; সেট] বলতে পারার স্থখ, গল্প করতে পারার স্থখ, সর্বাধুনিকের আস্বাদ নেবার সামাজিক এবং স্নবিশ কগু মনের তৃপ্তি। যারা সামাজিক জীবনে ধোপছুবস্ত হ'য়ে চলতে চায়, তারাই নব্যতমের প্রধানতম খদ্দের; খাওয়া পরা, পড়া (অন্তত বইয়ের নাম শোন] ), চড়া, সমস্ত বিষয়েই নতুন থেকে নতুনতরর পশ্চাদ্ধাবান ক'রে এরা যে কখনো ক্লান্ত হল্ না, তার কারণ এগুলো সামাজিক ক্ষেত্রে মূল্যবান, আর এদের কাছে

তঠ

আকাশ-ধাত্রী

সামাজিক মূল্যটাই চরম। বন্ধুমহলে ক্ষণিক গৌরবলাভের জন্য, কথাবার্তার ফুটন্ত কেটলিতে হঠাৎ কয়েকট! বিন্ময়চিন্তের বুদ তোলার জন্য, কিংবা নেহাৎই প্রতিযোগিতায় অন্ত কারে কাছে হেরে না-যাবার জন্ত-_ শুধু এর জন্য প্রচুর পরিশ্রম, প্রভূত অর্থব্যয় করে এরা, দেহে-মনে নানারকম কষ্ট সহ্থ করে, বেড়াতে যায় ( মনে-মনে বিরক্ত হ'য়ে) রোম অথেন্ন ইন্তান্থুলে, ক্লাস্তিকর উপন্যাসের পাতা ওণ্টায়, অন্তঃসারশৃন্ সিনেমা গ্ভাখে ব'সে-ব'সে, প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে হালফ্যাশনের মহামূল্য চিকিৎসা করায়, তথাকথিত ভাই- টামিনে ভর! বিশ্বাদ খাবার চিবোয়, আতস কাচের চশম! পরে মনের আয্পন! চোখ ছুটোকে ঢেকে দেয়, দৃষ্টিশক্তিবও সর্বনাশ করে। আমি যদি এই ফ্যাশনজীবী সম্প্রদায়ের অন্তভূ্ত হতুম, তাহ'লে এই কমেটে চ'ড়ে নগদ কিছু পাওনা জুটতো!৷ আমার-_- আর-কোনে৷ কারণে নয়, এটা নতুনতম ব'লেই। আমেরিকাতে এসেও দেখেছি, আমি কমেটযাত্রী ছিলুম শুনে লোকের! কৌতুহলী হ'য়ে, এমনকি একটু ঈর্ধক চোখে, আমার দিকে তাকিয়েছে ; এতে বোঝা যায় যে আজকের দিনে, অর্থাৎ এই বিশ শতকের ষষ্ঠ দশকের গোড়ার দিকে, এই ব্যোমযান বিম্ময়কর ব'লে বিখ্যাত হয়েছে। কিন্তু সত্যি কি বিস্ময়কর?

এই কথাটাই-_ বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে হয়তো বিহার, হয়তো উত্তরপ্রদেশের উপর দিয়ে যেতে-যেতে, কোলে বই, চিঠি লেখার কাগজ, হাতে ঈষদুষ্ণ নিম্বাদ চায়ের পেয়ালা-_ এই কথাটাই ভাবছিলুম মনে-মনে। এই তো ভোগ করছি আধুনিক বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ একটি উপহার, মানুষের শক্তির একটা অবিশ্বাস্য অথচ অনন্বীকাধ প্রমাণের মধ্যে বসে আছি, কিন্তু, কিন্ত-_ তাতে হয়েছে কী? ভেবে দেখতে গেলে ব্যাপারটা এত বিম্ময়কর যে মাহ্ষের প্রায় পাগল হ'য়ে যাবার কথা-_ কিন্তু মুহূর্তের জন্যও বিস্ময়ের শিহরন কি অন্গভব করলাম? কই, না তো। সবচেয়ে আশ্র্য এইটেই যে একটুও আশ্চর্ষের ভাব লাগলে! না ; যে-রকম শুনেছি, ভেবেছি, তো ঠিক সেই রকমই, বরং (কোনো-কোনো! বিষয়ে একটু নৈরাশ্তরজনক-_ এতে অবাক হবার কী আছে? যে অনেক, অনেক উঁচুতে উঠবে, অনেক, অনেক ভ্রুতবেগে চলবে, এ-সব তো জান! কথাই, প্রথম থেকেই তা মেনে নিয়েছি আমরা, ধ'রে নিম্েছি স্বীকৃত ব'লে-_ এর মধ্যে বিস্ময়ের অরকাশ কোথায়?

ন১

দেশাস্তর

আসল কথাটা এই যে ম্যালথস-বণিত কৃষিক্ষেত্রের মতো, এ-যুগের বিস্ময়ের ফসলেও প্রগতিশীল ক্ষীয়মাণতা লক্ষ করা যাচ্ছে কথাট] হঠাৎ একটু অদ্ভূত শোনাবে, কেননা গত একশো-দেড়শো বছরের মধ্যে ফলিত বিজ্ঞান যত অসংখ্য এবং বিচিত্র রকমের বিস্ময়কর বস্তর আমদানি করেছে, সত্যতার ইতিহাসে এমন কখনে৷ আগে ঘটেনি কিন্তু সেইজন্যই-_ যেহেতু বিস্ময়ের বস্ত মানুষের সামনে বিপুল পরিমাণে পুঞ্জিত হ*য়ে উঠছে, ঠিক সেই- জন্যই তার বিস্ময়ের বোধ কমতে-কমতে অবলুপ্তির প্রান্তে এসে ঠেকলে]। যখন প্রত্যেক দশ বছর, পাচ বছর, ছু-বছর পর-পর কোনো-না-কোনো যুগাস্তরকারী' আবিষ্কারের উদগম হ'তে থাকে, এবং বছর-বছর, মাসে-মাসে, সপ্তাহে-সপ্তাহে নতুন থেকে আরো নতুনের, অদ্ভুত ছেড়ে আরো অদ্ভুতের প্রাচূর্ষে মানুষের দম আটকে আসার দশা হয়, তখন তার অবাক হবার শক্তি আর থাকে না, আত্মরক্ষারই জৈব প্রয়োজনে মন তার নিজের চারদিকে অভ্যাসের শক্ত খোলশ গণ'ড়ে তোলে রোজ-রোজ উৎসব হ'লে মানুষ তাতে আনন্দ পায় না, রোঁজ-রোজ চেঁচিয়ে উঠে লক্ষ দেবার কারণ ঘটলে মানুষ শেষ পর্যস্ত চুপ ক'রেই বসে থাকে আজকের দিনে হয়েছে ঠিক তা-ই; বিজ্ঞানের “মির্যাকল” যতই হুড়মুড় ক'রে ঘাড়ে এসে পড়ছে, একটার প্রতিধ্বনি নামিলোতেই আর-একটার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, যতই জমকালোভাবে পরবর্তীটা টেকা দিচ্ছে আগেরটার উপবঃ ততই আমরা উদাসভাবে, নিঃসাড়- ভাবে গ্রহণ করছি সেগুলোকে-_ যদিধ্না অবশ্য মনের মধ্যে সঙ্গে-সঙ্গে এই চিন্তার উদয় হয় যে এটার জন্য আগামী যুদ্ধ না জানি আরে! কত বীভৎস হ'য়ে উঠবে। জুল ভের্নের, এমনকি এইচ. জি, ওয়েলস-এর সময়েও যে-কথ। কল্পনা ক'রেও লোমহর্ণ হ'তো, সেগুলো যখন বাস্তব হ'য়ে দেখা দিলো, তখন দেখতে-না-দবেখতেই তাদের স্থান হ'লো দৈনন্দিনের মলিন তালিকায়-_ 41) 0১০ 011 ০৪808109506 06 50170177010, 01011£5-

অবশ্য এক্ষেত্রে দেবদূতের পাখা ফে কেটে দিয়েছে সে “ফিলল্পফি' বা বিজ্ঞান নয়-_ সেটা আতিশয্য, বাহুল্য, আশাতীত এবং অনেক সময় অনাবশ্যক প্রাচর্ঘ। যখন মনের মধ্যে কোনো বিষয়ে অভাববোধ জেগে ওঠে, কিংবা কোনো দুর্লভ ইচ্ছা বহুযুগের সঞ্চিত তাপে ছটফট করে, তখন বিজ্ঞানের বলে তার তৃপ্তি ঘটলে মানুষ তা থেকে সত্যি-সত্যি আনন্দ পায়, বিস্ময়টাকে পুবো-

২২

আকাশ-যাত্রী

পুরি উপলব্ধি করতে পারে। এই রকম অনেক ছুরাঁশা, অনেক অসম্ভবের আকাজ্ষীকে চরিতার্থ ক'রেই নবীন বিজ্ঞান মন পেয়েছিলে! মানুষের, সনাতন ধর্মবিশ্বাসের উপর জয়ী হয়েছিলো কিন্তু এই জয়ের অধ্যায় অতীত হ'য়ে গেছে, বিজ্ঞান তার মনোহরণ যৌবন হারিয়ে বৈশ্ঠবৃত্তির সেবা করছে আজকাল, কান ছুটোকে উৎস্থক রেখেছে সামরিক হুকুমজারির দিকে নিত্য-নতুন সামগ্রী উদ্ভাবনে আজকের দ্দিনে এই যে তার ছুরস্ত ক্ষিপ্রতা দেখছি, তার পিছনে মানবসমাজের কোনে! সত্যিকার চাহিদা নেই, আছে ব্যবসাবুদ্ধি, ধনের লোভ, যুদ্ধে জয়ী হবার প্রস্তুতি, বণিকের সঙ্গে বণিকের এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে বাষ্ট্ের প্রতিযোগিতার সংঘর্ষ তাই খিদে না-জাগতেই খাবার এসে হাজির হচ্ছে, আর সেই ভোজও এমন বিপুল যে কোনটা ফেলে কোনটার দিকে তাকাবে, সে কথা কেউ ভেবে পাচ্ছে না ফলত, মানুষ আজকাল কোনোটার দিকেই তাকাচ্ছে না, যেটা সবচেয়ে সহজে হাতের কাছে এসে পড়ছে সেটাকেই কোনোরকমে মুখে তুলে ছিবিয়ে-চিবিয়ে ফেলে দিচ্ছে অবস্থাটা ধনীর ছুলালের মতো, অত্যন্ত বেশি উপচারের ভারে মনটা যার ম'রে গেছে, রাশি-রাশি দুর্মূল্য খেলনাকে যে তার সম্পত্তি বলে ভাবতে শিখেছে, কিন্ত কোনোটা থেকেই এক ফৌোট। আনন্দ পাবার শক্তি যার নেই। আগে প্রয়োজনবোধ জেগে ওঠে, তারপর সেটা মেটাবার ব্যবস্থা হয়, এই হ'লো স্বাভাবিক নিয়ম ; কিন্তু আধুনিক বৈশ্ঠবিধানে আগে সামগ্রীটাকে উপস্থিত করা হয়, তারপর তার চাহিদা জাগিয়ে তোলা হয় অবিরাম বিজ্ঞাপনের চাবুক মেরে-মেরে। আজকালকার ছোটো-বড়ে যান্ত্রিক উদ্ভাবন কোনোটাই এই অধৈর্ধপ্রস্থত হীনত থেকে মুক্ত নয়। বিজ্ঞানের যেটা সাধনার দিক, জ্ঞানের দিক, সেটাকে মানুষ তেমন স্পষ্ট ক'রে আর দেখতে পাচ্ছে না, বিজ্ঞান বলতে তার মনে পড়ছে স্থবিধে, স্থযোগ, আয়াসের লাঘব, ব্যসনের বৃদ্ধি, কিংবা! কোনো অর্থকরী প্রস্তাব, আর নয়তো কোনো৷ আণবিরুতর অস্ত্রের আতঙ্ক। সাধারণ মানুষ ধরেই নিয়েছে যে বিজ্ঞানীর কাজই হ'লো-_ যতক্ষণ তিনি হনন-যজ্জের সমিধসংগ্রহে ব্যস্ত না আছেন-__- তার জন্য সময়-বাচানো, খাটুনি- বাঁচানো, আরাম-বাড়ানো, আমোদ-জোগানো রাশি-বাশি খেলনা তৈরি কর]। খেলনা, নেহাৎই খেলনা, কেননা ওগুলে। না-পেয়ে সবে যে ছুঃখে ছিলো তা নয়, আর পেয়ে যে কোন স্থুখ হ'লো, তাও সে ঠিক জানে না।.. যন্ত্রের মতোই

দেশীস্তর

য্ত্রগুলোকে সে ব্যবহার করে, ওগুলো! থেকে তার শ্রদ্ধা চ'লে গিয়েছে, কোনোটাতেই আর মনোযোগ নেই। যখন আজকের নতুন কালকের দিনেই বাসি হয়ে যাবে, তখন আর নিবিষ্ট হয়ে শক্তিক্ষয় করে কে।

একটা দৃষ্টাস্ত নেয়া যাক ঘরে ব'সে দূরকে দেখবো, এই বায়না ক্যামেরার ছবির সাহায্যে প্রথম যেদিন মিটলো! সেদিন ভারি খুশি হয়েছিলো মানুষ | প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই তার আবো আবদার : যে কাছে নেই তার সঙ্গে কথা বলবো, যে-কথা বল! হ'য়ে গেছে সেটা আবার শুনবো তাঁও সম্ভব হলো : শব্ের ঢেউ বাধা পড়লো! মোমের থালায়, চলাচল করলে। তারের মধ্য দিয়ে দূরে মানুষ মুগ্ধ বিন্ময়ে এই যন্ত্রগুলোকে অভ্যর্থনা করলে, আর সেই উচ্ছ্বাস থামতে- না-থামতেই ক্যামেরার ছবি চলন্ত হ'লো, তারপর সেই ছবির সঙ্গে একন্থত্রে ধ্বনিও বাধা পড়লো একদিন। কিন্তু এতেও কুলোচ্ছে না, রেডিওট1 এখন প্রায় প্রাগৈতিহাসিক, ঘরে-ঘরে টেলিভিশন চাই ; আর সিনেমার ছবিতে নায়িকার লঙ্জা-পাওয়] গালের রংটুকু পূর্যস্ত যখন দেখানে৷ গেলো, তখন তৃতীয় আয়তনটাই বা বাকি থাকে কেন। আমরা যারা প্রাচ্যদেশে পেছিয়ে আছি, আমাদের উপর নতুনের এই দৌবাত্ম তেমন দুঃসহ নয়, য়োরোপের চালচলনও কিছুটা রাঁশভারি, কিন্তু আমেরিকায় শোনা যাচ্ছে তিন-আয়তনের সিনেমায় এরই মধ্যে অরুচি ধ'রে গেছে লোকের- ওটা চলবে" কিনা, সে-বিষয়ে ব্যবসায়ী মহল সন্দিপ্ধ হ'য়ে উঠছেন। আর এই নব্যতমকে নিয়ে কোথাও তেমন হুলুস্থলও উঠলো না, এটাও লক্ষ করার বিষয় প্রথম যখন রেডিও দেখা দিলো, কথা-বলা সিনেমা বেরোলো, তখন যেমন পৃথিবী ভরে উত্তেজনার ঢেউ দিয়েছিলো, সে-তুলনায় টেলিভিশন কিংবা তিন-আয়তনের আমদানিটাকে কেউ যেন তেমন ক'রে লক্ষই করলে না। আসল কথাটা এই যে এগুলোর জন্য মানুষের মনের মধ্যে কোনে। ইচ্ছে জেগে ওঠেনি ; রেডিওতে গান শোনার সঙ্গে-সঙ্গে গায়ককে চোখে দেখার জন্য অতিশয় কাতর হ"য়ে পড়েনি কেউ, এমন কথাও কখনো কারে! মনে হয়নি যে সরব এবং বঞ্চিত সিনেমায় মামুষগুলোর তৃতীয় আয়তনটা নেই ব'লেই সব ব্যর্থ হ'য়ে গেলো ছবিতে এঁ অভাবটা আমরা অনুভব করি নাঁ সেটাই ছবির মায়_ যেমন আমরা! আশা করি ন। ভাস্করের গড়৷ মৃত্তির গায়ে বর্ণপ্রলেপ আধুনিক যুগে মুত্তির ধর্মই বর্ণহীনতা, ছবিও তার ছুটোমাত্র আয়তনের মধ্যেই স্থসম্পূর্ণ_ তা সে অচল চঞ্চল যা-ই

আকাশ-যাত্রী

হোক না-_ বাস্তবের কোনো-একটা অঙ্গ বাদ দিয়েই বাস্তবকে সার্থকভাবে প্রকাশ কর! হয়, কোনো শিল্পই মাছি-মারা নকলনবিশি করে না। যেটা বাদ পড়লো, সেটাকে নিজের মন থেকে ভ'রে তোলা মানুষের আবহমান অভ্যাস, তার উপভোগের জন্যই অবকাশটুকু প্রয়োজন। এই-যে তিন আয়তনের আজব সিনেমা, এটার উৎপত্তি হয়েছে দর্শকদের আকাজ্ফার ক্ষেত্রে নয়, বাণিজ্যের সম্প্রসারণের তাগিদে__ উত্তাবকের আজ্ঞাবহ উর্বর মন্তিকে। যে ভোগ করৰে তার দিক থেকে চাহিদা! ছিলো না, যে বেচবে তার গরজটাই বড়ো ; তারই তাড়ায় যন্ত্রশিল্পীর এক দণ্ড ছুটি নেবার উপায় নেই। যে-শক্তি মানুষ আজ পেয়েছে প্রচণ্ড শক্তি-_- সেটাকে নিয়ে সে কী করবে, তা যেন ভেবে উঠতে পারছে না; এলোমেলো, অস্থির, উদ্ত্রান্তভাবে শুধু বানিয়ে যাচ্ছে, বাড়িয়ে যাচ্ছে; সবুর সয় না, ভাববার সময় নেই 3 “কেন”, “কিসের জন্য”, এই প্রশ্নগুলো নেহাৎ অবান্তর হয়ে গেলো, যে-কোনো উপায়ে শক্তির ব্যবহার করতে না-পারলে সে যেন দম ফেটে ম'রে যাবে। ঘণ্টায় তিনশো মাইল বেগবান এরোপ্নেন পাঁচশো মাইল যাচ্ছে না কেন, তার জন্য কোনো সুস্থ মানুষের আক্ষেপ ছিলো না, আর যখন পাঁচশে। মাইলও সম্ভবপর হ'লো, তখনও সেটা লোকের1.যেন প্রাপ্য বলেই যেনে নিলে__ বেশি কিছু উচ্চবাচ্য করলে না। কেননা, যখন শোনা যাচ্ছে যে এই বেগ অচিবেই পাতশো! কিংবা আটশোর কোঠায় পৌঁছবে, তখন মাত্র পাঁচশোতেই বিল্ময় প্রকাশ ক'রে কেউ বোকা বনে যেতে রাজি নয়। কিন্তু সাতশোতেই কি বিন্ময়ে ধুম পড়ে যাবে চারদিকে? গ্িক উল্টো; সাতশো, আটশো, হাজার হবে, আমাদের মনে চমক লাগবে আরো কম, কেননা যন যতই আশ্চর্য থেকে